1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৪:০৪ অপরাহ্ন

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের স্মৃতি | অধ্যক্ষ শাহজাহান সাজু

  • প্রকাশ : বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ৩৮২ বার
ইনসেটে অধ্যক্ষ শাহজাহান সাজু

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানী ঢাকার অদূরে গাজীপুরের বোর্ড বাজারে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার আর্থিক সহযোগিতায় ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষা বর্ষে ২০০ জন ছাত্র নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়য় যেখানে ভর্তির আবেদনে নূন্যতম যোগ্যতা ছিল ৫ (পাঁচ) পয়েন্ট। অর্থাৎ এসএসসি এবং এইচএসসিতে একটিতে প্রথম বিভাগ ও একটিতে ২য় বিভাগ বাধ্যতামূলক ছিল। তখন ছাত্রদের বৃত্তি হিসেবে ওআইসি থেকে ১৫০ মার্কিন ডলার বৃত্তি পাওয়ার কথা শুনে আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি ছিলেন ড. এন এম মমতাজ উদ্দিন চৌধুরী। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কতিপয় পদক্ষেপ আমাদের হতবাক করে। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে স্বাধীনতা বিরোধী একটি বিশেষ সংগঠনকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার সুযোগ প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ না দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে ১০০ নম্বরের ইসলামী ও আরবী শিক্ষা গ্রহন, বিশ্ববিদ্যালয় কোন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করতে না দেওয়া, অমুসলিম ও ছাত্রীদের ভর্তির সুযোগ না দেওয়া, ভর্তি ক্ষেত্রে মাদ্রাসা ছাত্রদের আসনের ৭৫% সংরক্ষণ রাখা প্রভৃতি। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি করার সুযোগ না দেওয়া এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করারও সুযোগ ছিল না।

১৯৮৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিজয় দিবসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোন কর্মসূচী গ্রহন না করলে আমরা ছাত্ররা প্রতিবাদ জানাই। আমরা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে গাড়ীর ব্যবস্থা করতে বললে ভিসি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনকে অনৈসলামিক ফতোয়া দেন। তিনি ঘোষনা দেন স্মৃতি সৌধে যারা ফুল দিতে যাবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গাড়ীর ব্যবস্থা গ্রহন না করলে আমরা ছাত্ররাই চাঁদা দিয়ে একটি ট্রাকের ব্যবস্থা করে সাভারে স্মৃতিসৌধে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করি। এতে উপাচার্য আমাদের প্রতি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হন। এর কয়েকদিন পরই ১৯৮৭ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শহীদ দিবসের পূর্বেই বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারের দাবি জানাতে গেলে ভিসি চরমভাবে আমাদের তিরস্কার করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের হুমকি প্রদান করলে ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সুষ্পষ্ট জানিয়ে দেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে শহীদ মিনার নির্মাণ না করলে আমরা ছাত্ররা নিজ উদ্যোগেই ক্যাম্পাসে শহীদ মিনার নির্মাণ করব। এই দাবীতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির নিকট স্মারকলিপি প্রদান করি। ২১ ফেব্রুয়ারির পূর্বেই ক্যাম্পাসে শহীদ মিনার নির্মাণের দাবী জানিয়ে যে চারজন স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেছিলাম উপাচার্য আমাদের ডেকে নিয়ে কঠোর দমক দেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন শহীদ মিনার নির্মাণ করা হবে না। এটা ইসলাম বিরোধী। এ ব্যাপারে যারা বাড়াবাড়ি করবে তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হবে। এক পর্যায়ে উপাচার্যের সাথে আমাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।

১৯৮৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। ভাষা সৈনিক এডভোকেট গাজীউল হককে প্রধান অতিথি করে সেই শহীদ মিনার উদ্ধোধনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। প্রগতিশীল সকল ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে। এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগের দিন ১৯ ফেব্রুয়ারি আকস্মিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষনা করে এবং আবাসিক ছাত্রদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়। কিন্তু আমরা সেই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে হলেই অবস্থান করি। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ২০ তারিখের পরবর্তে ১৯ তারিখ রাতের মধ্যেই শহীদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহন করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে শহীদ মিনারের স্থান নির্বাচন করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ ইং সন্ধায় আমরা নিজেরাই ইট, বালু, সিমেন্ট সংগ্রহ করে শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু করলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ জনগন আমাদের সহযোগিতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে তারা পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমে শহীদ মিনার নির্মাণ বন্ধ করতে চেষ্টা চালায়। ঘটনার বাস্তবতা উপলব্ধি করে পুলিশ প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করে। আমরা ছাত্ররা সারারাত জেগে স্বতঃর্ফুর্তভাবে শহীদ মিনার নির্মাণ করি।

পরদিন ২০ ফেব্রুয়ারি প্রখ্যাত ভাষা সৈনিক এডভোকেট গাজীউল হক শহীদ মিনারটির উদ্ধোধন করেন এ সময় কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রিয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। পরদিন জাতীয় সকল পত্রিকায় গুরুত্বের সাথে সংবাদটি প্রকাশিত হয়। সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ক্যাম্পাসে শহীদ মিনার নির্মাণ করায় আমরা যে চারজন শহীদ মিনার নির্মাণের দাবী জানিয়ে আবেদন করেছিলাম তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করার কথা উপাচার্য মিডিয়াতে প্রকাশ করেন। শহীদ মিনারের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রদের বহিস্কারের ঘটনায় সারাদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। জাতীয় সংসদের তৎকালীণ বিরোধী দলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি’র চেয়ারম্যানপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ প্রগতিশীল বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সংস্কৃতি ও ছাত্র সংগঠনের চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। কিন্তু কয়েকমাস পর বিভিন্ন ইস্যুতে শহীদ মিনারে সাথে জড়িত আমি, রাজ্জাক, সোহেল, শিপন, সেলিম, কালামসহ ২০ জনের প্রমোশন বাতিল করা হয়।

এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে ব্যাপক আন্দোলনের ফলে সরকার উপাচার্য মমতাজ উদ্দিন চৌধুরীকে অপসারন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলামকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দান করে। সিরাজ স্যার ভিসি নিযুক্ত হবার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যাপক আয়োজনে ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করে। উল্লেখ একদিন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের অভিযোগে বহিস্কার হয়েছিলাম রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘ্য এক যুগ পর কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২০০০ ইং সালের ৫ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনার উদ্ধোধন করেছিলেন। আমার পরম সৌভাগ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে তাঁর সফর সঙ্গী হিসেবে আমাকে সেই অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ আমার হয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ায় আজ শুধু শহীদ মিনারই নির্মাণই নয় সংস্কৃতি চর্চার চারণ ভূমিতে পরিনত হয়েছে।

লেখক: বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ

...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews