1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৫:২৬ অপরাহ্ন

কতটা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে বন্দরনগরী

  • প্রকাশ : বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ৭৩ বার
ফাইল ছবি

মো. ইকবাল সরোয়ার:
বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের তুলনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সচেতনতা ও সমন্বয়ের অভাবে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের ৬৫-৭০ লাখ মানুষ এখন মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্যোগের হুমকিতে রয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থান, চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের নানাবিধ সুযোগ-সুবিধার কারণে চট্টগ্রাম নগরীর প্রতি মানুষের একটি বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ বর্গমাইল আয়তনের এ শহরে ৪.৫ শতাংশ হারে নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে বস্তিসহ নানা ধরনের স্থাপনা, আবাসন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু ক্রমবর্ধমান নগরবাসীর চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে পর্যাপ্ত বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলার মাঠ ও মার্কেটের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে এসব নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি করতে গিয়ে পুকুর, জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান, খাল-বিল দখল বা ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম নগরীর অনেক স্থানে এখন পুকুর, জলাশয়, খাল দখল অথবা ভরাট করে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বস্তি গড়ে তোলা হচ্ছে।

শহর এলাকার পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্যোগের সময় আগুন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক, বস্তি, শিল্প ও মার্কেট এলাকায় পর্যাপ্ত পানির উৎসের অভাবে অগ্নিকাণ্ডের ফলে চট্টগ্রাম নগর এলাকায় মারাত্মক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।

পর্যাপ্ত পানির অভাবে ফায়ার সার্ভিস বাহিনীর শত প্রচেষ্টাও তখন আগুণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হতে পারে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া জলাশয় ও পুকুর ভরাট অবৈধ হলেও চট্টগ্রাম নগরীতে পুকুর-জলাশয়-ডোবার ভরাট কাজ চলছে নির্বিঘ্নে। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলাধার সংরক্ষণে বিভিন্ন সংস্থার উদাসীনতা এর জন্য দায়ী।

২০০১ সালে প্রণীত আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার, জেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএ জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ করবে। কিন্তু এ আইনকে বিভিন্নভাবে ফাঁকি দিয়ে পুকুর ও জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে।

১৯৯১ সালে জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রামে জলাশয়ের সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ২৫০; অন্যদিকে সিডিএ’র ডিটেইল এরিয়া পরিকল্পনার আওতায় ২০০৬-২০০৭ সালে ৭৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জলাশয় চিহ্নিত করা হয়েছে ৪ হাজার ৫২৩টি। বর্তমানে এ জলাশয়ের সংখ্যা ১ হাজারের মধ্যে নেমে এসেছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে চট্টগ্রাম শহরের শপিং মলের ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শপিং মলে ফায়ার সেফটি ডিজাইন এবং পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে।

ওই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মাত্র ২৭ শতাংশ মার্কেটে ফায়ার এলার্ম রয়েছে এবং অধিকাংশ মার্কেটের দোকান মালিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবহার জানেন না। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ভবনগুলো একটির সঙ্গে অন্যটি এত লাগানো থাকে যে, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে কাজ করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া এক ভবন থেকে অন্য ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ১৩ শতাধিক অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনায় প্রায় ২০ জন প্রাণ হারায় এবং ২৫ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়। এ শহরের উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত, বিশেষ করে বস্তি এলাকার মানুষ সবাই কম-বেশি অগ্নিকাণ্ড ঝুঁকিতে রয়েছে। এখানকার উঁচু ভবনগুলো এতই ঘনবসতি হয়ে তৈরি হচ্ছে যে, লিফট ও মূল সিঁড়ি ছাড়া বিকল্প সিঁড়ি রাখাও অসম্ভব। এর ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় ধোঁয়ার কারণে বের হতে না পেরে অনেক মানুষ মারা যেতে পারে। এছাড়া বস্তিগুলোও অনেক ঘনবসতিপূর্ণ; ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে শহরের ৪১টি ওয়ার্ডকে ৮টি জোনে ভাগ করে অগ্নিঝুঁকি সংক্রান্ত এক জরিপ করা হয়। এ জরিপ অনুযায়ী ৪৫টি মার্কেট, ১৩টি বস্তি ও ৩০০টি বহুতল ভবনকে অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী এ ১৩টি বস্তিতে প্রায় ১ লাখ মানুষ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের রেয়াজউদ্দীন বাজারসংলগ্ন তামাকুণ্ডি লেন, জহুর হকার মার্কেট এবং এর আশপাশে সব মার্কেট মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডজনিত নগর দুর্যোগের হুমকিতে রয়েছে।

নগরীর মার্কেট ও দোকানগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি লাগানো এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নেই। ১৮ অক্টোবর ২০১৯ রাতে জহুর হকার্স মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের কারণে ১০৫টি দোকান পুড়ে যায়। শুধু নিকটবর্তী পানি সংকট থাকায় এবং সরু সড়কের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। তাছাড়া মাকের্টের সরু পথ থাকায় এখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও প্রবেশ করতে পারেনি।

একইভাবে ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শহরের মির্জাপুল এলাকার বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে প্রায় ২০০ ঘর পুড়ে যায় এবং আহত হয় ২০ জন। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি গাড়ি আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। সরু গলি এবং অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেক বেগ পেতে হয়। এছাড়া পার্শ্ববর্তী কোনো পানির উৎস না থাকায় ৮-৯টি হোস পাইপ দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের পর্যাপ্ত সড়ক এবং পুকুর-জলাশয়-ডোবা নিকটবর্তী স্থানে থাকলে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমানো যেত।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অগ্নিকাণ্ডজনিত নগর দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য নিন্মোক্ত সুপারিশগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে :

ফায়ার সার্ভিস বাহিনীকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ; অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধি; অগ্নিকাণ্ডের সময় উদ্ধার কাজ নির্বিঘ্নে করার সহায়তা; অগ্নিনির্বাপণের জন্য পানির পৃথক লাইন ও জলাধার সংরক্ষণ; আবাসিক-শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং বস্তি এলাকার বৈদ্যুতিক তারের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পরীক্ষা, চট্টগ্রাম শহরের আবাসিক-বস্তি এলাকা, শপিং মল অথবা স্কুল-কলেজগুলোতে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার আয়োজন, সর্বোপরি জাতীয় বিল্ডিংকোড এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: iqbalsrwr@cu.ac.bd

...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews