1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৯:৫৪ অপরাহ্ন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা মোবাইল ফোনের সদ্ব্যবহার ও অপব্যবহার

  • প্রকাশ : সোমবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ১৫৩ বার

মোহাম্মদ হাসান:
যে কোনো জিনিসেরই যেমন সদ্ব্যবহার আছে, তেমনি অপব্যবহারও আছে। ওষুধ যেমন আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধের সাহায্যে আমরা নিরাময়ের পথ খুঁজি। এটাকে সদ্ব্যবহার বলতে পারি। কিন্তু, যখন আমরা নিজের ইচ্ছে মতো, অনেক সময় প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত ওষুধ খেতে শুরু করি— তখন তা অপব্যবহারের চেহারা নেয়। এই অপব্যবহারের কারণে ক্ষতিকর পরিণতির মুখোমুখিও হই আমরা অনেকেই।

যেমন কম্পিউটার/ মোবাইল ফোন/ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেরও অজস্র সদ্ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, তেমনি আছে অপব্যবহারেরও প্রবণতা, যা একসময় আসক্তি (নেশা) কিংবা অতিরিক্ত নির্ভরতায় পরিণতি পায়।
কম্পিউটার নির্ভর তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব আজ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আক্ষরিক অর্থেই হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। মুহূর্তে আমরা বিশ্বের একেবারে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারি কথা।

তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক বা সামাজিক গণমাধ্যমের পথ চলার শুরু। সেই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক অরকুট থেকে শুরু হয়ে টুইটার, ফেসবুক, হোয়াটস্অ্যাপ, ইনস্টাগ্রামে আজ জুড়ে দিয়েছে সারা পৃথিবীকেই।

ইন্টারনেট-নির্ভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কের উপযোগিতা কিংবা সদ্ব্যবহারের উদাহরণ মুঠো মুঠো। বহু হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে খুঁজে নিতে, সমমনস্ক বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু গড়ে তুলতে; পারিবারিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-রাষ্ট্রীয় হিংসার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে; একাকিত্ব-নিঃসঙ্গতা দূর করতে; অজানা অনেক কিছু জানতে; ব্যক্তিমানুষের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যকে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে; বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনাকে উন্মুক্ত করে দিতে— সামাজিক গণমাধ্যম বা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এমন বহু ক্ষেত্রেই খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে, এ কথা অস্বীকারের কোনও উপায় নেই।

সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন মহলেই ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়েছে কম্পিউটার/ মোবাইল ফোন/ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রয়োজন-অতিরিক্ত ব্যবহার কিংবা অপব্যবহার নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক নির্ভরতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। একেবারে শৈশবেই এখন মুঠোফোন বা ট্যাব-এ হাতেখড়ি হয়ে যায় দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরও। কৈশোরে পা দিতে না দিতেই সোশ্যাল নেটওয়ার্কে প্রোফাইল তৈরি হয়ে যায়। দুনিয়াজোড়া ‘বন্ধুত্বের’ পাতা ফাঁদে অনায়াসে পা রাখে সদ্য কিশোর-কিশোরী! সারল্য আর অনভিজ্ঞতা নিজেদের অজান্তেই অনেক সময় তাদের অজানা বিপদের মুখে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়! বহু ক্ষেত্রেই ফেক বা মিথ্যা দিয়ে বানানো আকর্ষক প্রোফাইলের টান ডেকে আনছে বিপদ। কখনও রোম্যান্টিক প্রেমের হাতছানি, কখনও সেক্স চ্যাটের উত্তেজক উষ্ণতা, কখনও পর্নোগ্রাফির নিষিদ্ধ জগৎ কৈশোরকে করে তোলে নানা ভাবে বিপন্ন।

সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ভারচুয়াল বন্ধুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেলেও বাস্তবে বন্ধুর সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলার সময়ও ক্রমশ কমতে থাকে। প্রায় সমস্ত সময় চলে যায় হাতের মুঠোয় ধরে থাকা ফোনে কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে! ক্রমশ একা হতে থাকা, বাস্তবের কাছের মানুষদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকা! অনেক সময় দেখা যায়, শিশুকিশোর থেকে বৃদ্ধ প্রায় সকলেই একসঙ্গে এক জায়গায় বসেও ব্যস্ত নিজের নিজের মোবাইল ফোন/ ট্যাব/ কম্পিউটার নিয়ে! পরিবার হোক কিংবা বন্ধুদের একসঙ্গে কোথাও যাওয়া, সর্বত্রই এই ছবি দেখে থাকি আমরা! একে অপরের সঙ্গে নয়, সবাই ব্যস্ত হয়তো ভারচুয়াল বন্ধুর সঙ্গে আলাপে। একসঙ্গে অনেকে থেকেও, সবাই এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা! এই বিচ্ছিন্নতার পরিণতি ভবিষ্যতই বলবে! তবে পরিবারে কিংবা বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক-নির্ভরতার কারণে অন্যদের মনে ‘অবহেলিত’ হওয়ার অনুভূতি ক্রমশ গুরুতর আকার নিচ্ছে, যা পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রবল ভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

মাদক দ্রব্যের উপর যে ধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়, সেই নির্ভরতার দুটো দিক থাকে। একটি শারীরবৃত্তীয়, অন্যটি মানসিক। সোশ্যাল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে যে নির্ভরতা তৈরি হয়, সেই নির্ভরতায় শারীরবৃত্তীয় নির্ভরতা হয়তো তেমন থাকে না, কিন্তু মাদক-নির্ভরতায় মানসিক নির্ভরতার যে লক্ষণগুলো দেখা যায়, তার সবগুলোই থাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্ভরতায়।
যেমন- সর্ব ক্ষণ মন জুড়ে থাকা; ক্রমশ ব্যবহারের মাত্রা বাড়তে থাকা; ব্যবহারের স্বপক্ষে নানা ওজর বা অজুহাত দেওয়া; নিয়ন্ত্রণ হারানো; জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে (যেমন পড়াশোনা, পেশাগত ক্ষেত্র, সম্পর্ক, সামাজিক মেলামেশায়) নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করা; অস্বীকারের প্রবণতা (যেমন ‘আমি তো এইমাত্র হাতে নিলাম’ কিংবা ‘কতক্ষণ আর নেটে থাকি’!); মেজাজের পরিবর্তন (সাময়িক ভাললাগার অনুভূতি তৈরি হলেও ধৈর্যের অভাব, বিরক্তি, রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকে); বেপরোয়া মনোভাব (‘বেশ করব’!); প্রতিকূল মানসিক পরিস্থিতিতে পড়লেই আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরা নেশার জিনিসটাকেই…

মোবাইল ফোনে কল বা মিসকল দিয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, অশোভন মেসেজ পাঠানো, চাঁদাবাজি করা, হুমকি দেয়া ইত্যদি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। মোবাইল ফোনের এ অপব্যবহারের ফলে হুমকির মুখে পড়ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এ ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ না নিলে এ প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মোবাইল ফোন আমাদের জীবনে গতি আনলেও এর অপব্যবহার নিয়ে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ভীতি। মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ে অভিভাবকরা চরম উৎকণ্ঠায় আছেন। এর অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। মোবাইল ফোন আমাদের সভ্যতার চেহারাটা পাল্টে দিয়েছে।
অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার। ‘মোবাইল ভিডিও’ নামক ভয়ঙ্কর উপসর্গ ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সমাজে। মোবাইলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, কথোপকথন, ভিডিও চিত্র মুহূর্তেই চলে যাচ্ছে সর্বত্র। আর এর প্রধান টার্গেট তরুণী ও মহিলারা। এর হাত ধরে কলুষিত হচ্ছে গোটা যুবসমাজ। সহজলভ্য মোবাইল ভিডিওর হাত ধরে তরুণেরা প্রবেশ করছে নিষিদ্ধ জগতে। নেশা থেকে পেশাদার অপরাধীতে পরিণত হচ্ছে তারা। সম্ভ্রম হারিয়ে নারীরা বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। ভাঙছে সংসার, ধ্বংস হচ্ছে পরিবার।প্রতিনিয়ত বাড়ছে আত্মহনন নারী নির্যাতন; অশ্লীল মেমোরি কার্ড তরুণদের হাতে; আইসিটি অ্যাক্ট থামাতে পারছে না সাইবার ক্রাইম।

এই সময়ে আমাদের নিজেদেরই এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানো আজ জরুরি, আমরা সত্যিই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক প্রয়োজনে ব্যবহার করছি, না অপব্যবহার! এই প্রশ্নের উত্তর যিনি ব্যবহার করছেন, তিনিই সব থেকে ভাল দিতে পারবেন।

লেখক: সংবাদ কর্মী, কলামিস্ট, পিএ সাবেক গণপূর্ত মন্ত্রী।

...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews