1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৩:২৮ অপরাহ্ন

সুন্দরবন: প্রকৃতির নীরব বিস্ময় | তানভীর মাহতাব আবীর

  • প্রকাশ : বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ৩৬৬ বার
সুন্দরবনের একাংশ

সিডর কিংবা আইলার তান্ডবের কথা মনে পড়ে? ২০০৭ সালের ১৫ ই নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ আঘাত হানে। সিডরের চোখের আয়তন ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ব.কি.মি. তবে ভয়াবহতার দিক থেকে সিডরের কারণে যে পরিমাণ ক্ষতির আশঙ্কা ছিল বাস্তবে হয়েছে তার অনেক কম। কারণ সিডরের প্রথম বাঁধা ছিল সুন্দরবন। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের বাঁধা পেয়ে সিডর অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সুন্দরবন না থাকলে সিডরের ধাক্কা লাগতো খোদ রাজধানী পর্যন্ত। সুন্দরবনের গাছপালায় বাঁধা পেয়ে সিডরের গতি ঘন্টায় প্রায় ৫০ কিমি কমে গিয়েছিল। ঠিক একইভাবে ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র সামনেও বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রকৃতির এই অপার বিস্ময়। এক সমীক্ষা বলছে, সুন্দরবনের কারণে ‘আইলা’ র গতি ঘন্টায় ৪০ কিমি ও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা চার ফুট কমে গিয়েছিল।
এভাবেই বারবার নিজে ক্ষত- বিক্ষত হয়ে প্রকৃতি ও জীবনকে বাঁচিয়ে যাচ্ছে নীরব এই বিস্ময়। আচ্ছা কেন নীরব বিস্ময় বলা এই বনকে? কেন-ই বা বাংলাদেশের গর্বের জায়গা সুন্দরবন? চলুন জানি সুন্দরবনের গল্প।

নামের রহস্য
সুন্দরবনের নাম ‘সুন্দরবন’ হওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ যায় না। তবে প্রচলিত ধারণামতে, এই বনে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা ‘সুন্দরী’ ( Heritiera fomes) গাছের নামানুসারে এই বনের নামকরণ। তবে অনেকের মতে, স্হানীয় আদিবাসীরা এই বনটিকে ডাকতো ‘চন্দ্র-বান্ধে’ নামে। এই নামটিই পরবর্তীতে বর্তমান রূপ পেয়েছে।

একটুখানি ইতিহাস
সুন্দরবনের উৎপত্তি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না, তবে ধারণা করা হয়, হিমালয়ের ভূমিক্ষয়জনিত পলি, বালি ও নুড়ি হাজার বছর ধরে বয়ে চলা পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র কর্তৃক উপকূলে চরের সৃষ্টি করেছে। অপরদিকে সমুদ্র তীরবর্তী হওয়ায় লবণাক্ত জলের ধারায় সিক্ত হয়েছে এ চর এবং জমা হয়েছে পলি। কালাতিক্রমে সেখানে জন্ম নিয়েছে বিচিত্র জাতের কিছু উদ্ভিদ এবং গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা লবণাক্ত পানির বন। সম্ভবত ১২০৩ সালে মোঘল এক রাজা পুরো সুন্দরবন ইজারা নেন। ১৭৫৭ সালে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সুন্দরবনসহ পুরো বাংলার দায়িত্ব নেয়ার আগে মোঘল রাজাদের অধীনেই ছিল এই বন। এই কোম্পানীই প্রথম সুন্দরবনের মানচিত্র তৈরি করে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ৬,০১৭ ব.কিমি বাংলাদেশ অংশে পড়ে। যা বাংলাদেশের সমগ্র বনভূমির ৪৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে সুন্দরবনে তিনটি অভয়ারণ্য ও ২০১২ সালে তিনটি ডলফিন অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনের ১,৩৯,৭০০ হেক্টর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকাকে ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে ইউনেস্কো।

কি নেই সুন্দরবনে!
পৃথিবীর অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বনভূমির উদ্ভিদের তুলনায় সুন্দরবনের উদ্ভিজ্জের মধ্যে ব্যাপক পরিমাণে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কেননা সুন্দরবনের বুক চিরে শুধুমাত্র নোনা পানি নয়, ক্ষেত্রবিশেষে প্রবাহিত হয় স্বাদু পানির ধারা। এই বৈশিষ্ট্যই সুন্দরবনকে পৃথক করেছে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বন থেকে। এ বনের পূর্বাঞ্চলীয় অভয়ারণ্যে গাছপালার বৈশিষ্ট্য কিছুটা বেশি। এখানে জন্মে সুন্দরী, গেওয়া, পশুর, কেওড়া, আমুর, গোলপাতা। পশ্চিমাঞ্চলীয় অভয়ারণ্যে বেশি দেখা যায় গেওয়া,গরান, হোন্তাল। দক্ষিণাঞ্চলীয় অভয়ারণ্যে বেশি দেখা যায় গেওয়া গাছ। এই অঞ্চলের লবণাক্ততা বেশি হওয়ায় অন্যান্য সাধারণ গাছ তেমন একটা জন্মাতে দেখা যায় না। সুন্দরবনে সঠিক কত প্রজাতির গাছ আছে বলা মুশকিল। সর্বশেষ ১৯০৩ সালের জরিপ বলছে, ৩৩৪ প্রজাতি। ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্য ৩৫টিরই দেখা মেলে এই বনে।

প্রাণী বৈচিত্র্যের কথা লিখতে গেলে প্রথমেই আসে অনিন্দ্য সুন্দর রয়েল বেঙ্গল টাইগারের (Panthera tigris) কথা। সুন্দরবন তথা গোটা বাংলাদেশেরই অহংকার জাতীয় এই পশু। একটা সময় সুন্দরবনজুড়ে অসংখ্য বিচরণ চোখে পড়তো এই বাঘের। কিন্তু অবৈধ শিকার, খাদ্যের অভাব, প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনে দিন দিন বাঘের সংখ্যা কমছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের জরিপে পুরো সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ১৭০ টি, এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে আছে ১০৬ টি। বাঘ ছাড়াও সুন্দরবনে আছে প্রায় ৩১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। যার মধ্যে চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, রেসাস বানর, বন বিড়াল, লেপার্ড, বন্য শূকর উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও আছে প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ, ৩০০ প্রজাতির পাখি, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী। সুন্দরবনে সাপের প্রচুর আনাগোনা দেখা যায়। এর মধ্যে আছে শঙ্খচূড়, রাসেলস ভাইপার, অজগর ও ব্যান্ডেড ক্রেইট।

অর্থনীতিতে সুন্দরবন
পর্যটনের এক আদর্শ স্পট সুন্দরবন। প্রতিবছর এই খাত থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় ৪১৪ কোটি টাকা। প্রত্যক্ষ- পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষ এই বনের উপর নির্ভরশীল। এই বনের জ্বালানী, নদীগুলোর বিশাল মৎস্য সম্পদ, মধু ও মোম এবং বন্যপ্রাণী থেকে বাংলাদেশের গড় বাৎসরিক আয় প্রায় ১১৬১ কোটি টাকা। লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, প্রাকৃতিক দূর্যোগের ভয়াবহতা থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের রক্ষা করে যাচ্ছে সুন্দরবন। গবেষণা বলছে, এই বন প্রতিবছর প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে রক্ষা করে ৩৮৮১ কোটি টাকার সম্পদ। আরও চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, সুন্দরবন বছরে গড়ে প্রায় ১৬ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম, আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য ৫-৬ বিলিয়ন ডলার।

কেমন আছে সুন্দরবন?
২০০৭ সালের ঘূর্নিঝড় সিডরে এই বনের ৪০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্হ হয়। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আজও লড়াই করে যাচ্ছে সুন্দরবন। গত বছরের (২০২০) নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় ”বুলবুল’ এর শক্তি যখন সর্বোচ্চ মাত্রায় ছিল, তখন ঘণ্টায় দেড়শ কিলোমিটার গতির বাতাস নিয়ে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছিল এ ঝড়। তবে উপকূল অতিক্রম করার আগে আগে এর শক্তি কিছুটা কমে আসে। সুন্দরবন ঘেঁষে খুলনার কয়রা দিয়ে যখন অতিক্রম করছিল ঝড়টি, সে সময় বাতাসের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯৩ কিলোমিটার ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামসুদ্দিন আহমেদ এই গতি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সুন্দরবনের বাঁধা হয়ে দাঁড়ানোর কথা বলছেন।

বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মঈন উদ্দিন খান বলেন, এবার বুলবুলের কারণে সুন্দরবনের খুব বেশি ক্ষতি হয়নি বলেই তারা আশা করছেন। “এমন করে একের পর এক প্রাকৃতির দূর্যোগের সামনে বাঁধার দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বন। নিজে ক্ষত-বিক্ষত হয়, হারায় অসংখ্য উদ্ভিদ আর প্রাণীর জীবন। বাঁচিয়ে দেয় খুব স্বার্থপর এই আমাদের।

প্রায়শই এই বনের নদীগুলোতে তেলবাহী ট্যান্কার ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে করে নদীগুলো দূষিত হয়ে যাওয়ায় মৎস্য সম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের কাছে সরকারের রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগে বিভিন্ন পরিবেশবাদী দল আন্দোলন করছে। তবে বিদ্যুত বিভাগ বলছে, সুন্দরবনের ইউনেস্কো হেরিটেজ থেকে প্রকল্পটি যথেষ্ট নিরাপদ দূরত্বে অবস্হিত। তাই এই প্রকল্পের জন্য বনের ক্ষতির কোনো আশন্কা নেই।

প্রতি বছর সুন্দরবনে হেক্টরপ্রতি গড়ে ২৭,৭৫০ চারা উৎপন্ন হয়। এ কারণেই এতসব বাধা বিপত্তি মোকাবেলা করেও সুন্দরবন বেঁচে আছে প্রকৃতির নিয়মে। মানুষের কল্যাণের স্বার্থেই এই বনের বেঁচে থাকা জরুরী। কারণ সুন্দরবন বেঁচে থাকলেই বাঁচবে বাংলাদেশ, বাঁচবে এদেশের জীব বৈচিত্র্য আর এদেশের মানুষ।

তথ্যসূত্র:
১. আবহাওয়া বিভাগ
২. সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)
৩. বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, চবি
৪. রোরবাংলা
৫. বন বিভাগ
৬. গুগল

লেখক: ৬ষ্ঠ ব্যাচ, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দূর্যোগ ব্যবস্হাপনা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews