1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
তওবার মাধ্যমেই বদলাতে পারে জীবন | মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী - Public Reaction
সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১১:২৬ পূর্বাহ্ন

তওবার মাধ্যমেই বদলাতে পারে জীবন | মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী

  • প্রকাশ : শুক্রবার, ১ মে, ২০২০
  • ১১৯ বার

গোনাহ মানুষের মজ্জাগত স্বভাব। ছোট-বড় গোনাহ সব সময় মানুষের থেকে সংঘটিত হয়। বড় মাপের বুজুর্গ পরহেজগার ব্যক্তিও গোনাহ তার থেকে হয় না এ দাবি করতে পারবে না। তবে একজন মুমিন এবং মুমিন নয় এমন একজন মানুষের মধ্যে পার্থক্য হলো, মুমিন যখন কোনো গোনাহে লিপ্ত হয় তখন সে তৎক্ষণাৎ আপন প্রতিপালকের প্রতি আত্মসমর্পন করে। ক্ষমাপ্রার্থী হয়। কুরআনুল কারিম এমন লোকদের গুণ বর্ণনা করেছে এভাবে- ‘তারা কখনও কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোনো মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তাই করতে থাকে না।’-(সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৫)।

মুমিন গোনাহকে ভয় পায়। এ মর্মে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন, মুমিন নিজের গোনাহকে এরূপ মনে করে, যেন সে কোনো পাহাড়ের নিচে বসা, যা সে তার উপর ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা করে। পক্ষান্তরে পাপাচারী ব্যক্তি আপন গোনাহকে দেখে- যেন একটি মাছি তার নাকের উপর বসলো, আর সে আপন হাতের ইঙ্গিতে তাকে তাড়িয়ে দিলো।’-(সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৪৯; মিশকাত, হাদিস ২৩৫৮)।

সাহাবা যুগে গোনাহের অনুভূতি: নবী কারিম (সা.)-এর পর সাহাবা যুগে যখন উম্মতে মুসলিমার কিছুটা পতন শুরু হলো। তখন কিছু কিছু গোনাহকে ছোট মনে করা হলে বিষয়টি দৃষ্টিতে আনা হলো। নবী সেবক সাহাবি হজরত আনাস (রা.) বলেছেন, লোকসকল! তোমরা এমন সব কাজ করে থাকো যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুলের চাইতেও সুক্ষ্ম। অথচ রাসূল (সা.)-এর জমানায় তোমরা সেইগুলোকে ধ্বংসাত্মক মনে করতাম।’-(সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৯২; মিশকাত, হাদিস ৫৩৫৫)।

অথচ আজ আমাদের অবস্থা হলো, বরাবরই আমরা ছোট-বড় গোনাহ করে যাচ্ছি। কিন্তু এগুলোকে আমরা গোনাহ মনে করি না। অথবা সাধারণ গোনাহ মনে করে অবহেলা করি। যেমন কোনো সংস্থা বা দলের অফিসের ছোট-ছোট জিনিস ব্যক্তিগত মনে করে ব্যবহার করা আত্মসাৎ এবং গোনাহ। কিন্তু আমাদের অনেক লোক এ ব্যাপারে অসতর্ক। কেউ ত্রুটি ধরিয়ে দিলে খুব সুন্দর একটা ব্যাখ্যা শুনিয়ে দেয়া হয়। এমনটা হচ্ছে আমাদের অন্তর থেকে আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস, হিসাব-নিকাশের দিবস, হালাল-হারামের পার্থক্য বিলকুল বের হয়ে যাওয়ার কারণে।

সগিরা গোনাহ থেকেও বিরত থাকা উচিত। তা নাহলে এই সগিরা গোনাহ তাকে কবিরা গোনাহের দিকে নিয়ে যাবে। এ জন্য বলা হয়, যখন সগিরা গোনাহ বারবার করা হয়, তখন তা আর সগিরা গোনাহ থাকে না। আর কবিরা গোনাহের জন্য তওবা-ইস্তিগফার করা হলে তখন সেটা আর কবিরা থাকে না।

তওবার প্রতি উৎসাহ প্রদান: কোনো গোনাহ হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত দয়াময়, ক্ষমাশীল। এমন বান্দাদের ওপর আল্লাহ রহমত এবং দয়া করেন যারা তাঁর দিকে প্রকৃত অর্থে আত্মসমর্পন করে। কুরআনুল কারিমে জায়গায় জায়গায় তওবা ও আত্মসমর্পনের উৎসাহ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন, মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে তওবা করো-আন্তরিক তওবা। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত।’-(সূরা তাহরিম, আয়াত ৮)। বিশিষ্ট তাফসিরকার আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, এর মানে হলো এমন সৎ ও দৃঢ় তওবা যা আগের পাপরাশিকে মুছে দেয় এবং তওবাকারীর মনে এমন অনুভূতির জন্ম দেয় যা ভবিষ্যতে তাকে গোনাহ থেকে দূরে রাখে।’-(তাফসিরে ইবনে কাসির ৪/৩৯১)। বিভিন্ন হাদিসেও তওবার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে। নবীজি (সা.) থেকে বেশি খোদাভীরু পরহেজগার আর কে হতে পারে? অথচ নবীজি (সা.) বলেন, হে লোকসকল! তোমরা রবের কাছে তওবা করো। আমি নিজে প্রতিদিন একশত বার তওবা করি।’-(মুসনাদে আহম, হাদিস ১৭৮৪৭)।

আল্লাহর পক্ষ হতে তওবার সুযোগ প্রদান: আল্লাহ তায়ালা তওবা করার জন্য আমাদেরকে সুযোগও দিয়েছেন। তাই আমলনামায় গোনাহ লেখার পূর্বে সুযোগ দেয়া হয় যে, বান্দা তওবা করে কিনা। এ মর্মে নবীজি (সা.) বলেছেন, বাম পাশের ফেরেশতা মুসলমান পাপী বান্দা থেকে ছয় ঘণ্টা কলম ওঠিয়ে রাখেন। অতঃপর সে যদি লজ্জিত হয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাহলে লেখেন না। নতুবা একটি পাপ লেখেন।’-(আলমুজামুল কাবির, তাবরানী, হাদিস ৭৭৬৫)।

এ ছাড়া মানুষকে তওবা করার জন্য আরও একটি সুযোগ দেয়া হয়। আর তা হলো, গোনাহ লেখার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তওবা কবুলের সুযোগ আছে। এ প্রসঙ্গে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম (সা.) বলেছেন, রূহ গলদেশে এসে আটকাবার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ পাক বান্দার তওবা কবুল করেন।’-(মিশকাত, হাদিস ২৩৪৩)।

সহজ নয় তওবা: তওবা জিনিসটি বাহ্যত অনেক সহজ মনে হয়। কিন্তু যত সহজ মনে হয় তত সহজ নয়। তওবা কবুল হওয়ার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি শর্ত। ১. বিগত দিনগুলোতে যে গোনাহগুলো হয়ে গেছে এর মন্দ পরিণামের ভয়ের সাথে সাথে অন্তরে খুব অনুশোচনা সৃষ্টি হওয়া। ২. শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়েই তৎক্ষনাৎ গোনাহ ছেড়ে দেয়া। মানুষের ভয়, বদনামের আশঙ্কা, সুনাম কুড়ানো, ইবাদতের শক্তি না থাকা এজন্য যাতে না হয়। ৩. সামনের দিনগুলোতে গোনাহ না করার দৃঢ় ইচ্ছা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিমতো তাঁর ফরমাবরদারি করে চলার সংকল্প গ্রহণ করা। কারও প্রতি জুলুম করে থাকলে তার থেকে মাফ নেওয়া। কারও হক খেয়ে থাকলে তাকে তা ফেরত দেওয়া অথবা পাওনাদারের কাছ থেকে মাফ নেওয়া। এই তিন জিনিস পরিপূর্ণভাবে পাওয়া গেলে তওবা পূর্ণাঙ্গতা পায়।

তওবার ওপর অটল থাকার উপায়: সর্বপ্রথম কর্তব্য তো দ্রুত তওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন। কেননা তওবাতে দেরি করাও একটি বড় গোনাহ। পাশাপাশি তওবা কবুল হলো কি হলো না এ ব্যাপারেও কম্পিত থাকা। এ কল্পনার মাধ্যমে দ্বিতীয়বার এ গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচা সহজ হবে। তারপর গোনাহের জায়গা, অসৎ বন্ধু-বান্ধবদের পরিত্যাগ করা। তা নাহলে পুনরায় এ পাপে লিপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান থাকে। কাছে কোনো ধরনের হারাম জিনিস থাকলে তা বিনষ্ট করে ফেলা। অন্যথায় এটি দ্বিতীয়বার পাপে ডুবানোর মাধ্যম হতে পারে। ভালো ও সৎ বন্ধু-বান্ধব নির্বাচন করে নেওয়া। যাতে তারা তাকে তওবায় অটল থাকতে সাহায্য করতে পারে। আল্লাহওয়ালাদের মজলিসে বেশি বেশি যাতায়াত করা। তাহলে তারা তাকে গোনাহ হতে বিরতে রাখতে পারবে। হালাল উপার্জন করে জীবন পরিচালনা করা। কোনো গোনাহকে ছোট মনে না করা। এ বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিলে এবং সাথে সাথে আল্লাহর শাহি দরবারে কান্নাকাটি ও রোনাজারি অব্যাহত রাখলে তওবা নসিব হবে।

শয়তানের প্রতিবন্ধকতা: শয়তান কখনও চায় না যে, মানুষ সৎ পথে চলুক। শয়তান সব সময়ই চেষ্টায় থাকে একজন বান্দা তওবার ইচ্ছা করলে তাকে কিভাবে তাকে এর থেকে বিরত রাখা যাবে। এজন্য শয়তান অনেক রকম কৌশল অবলম্বন করে থাকে। এজন্য শয়তানের ধোঁকায় পড়লাম কিনা সতর্ক থাকতে হবে।

লেখক : হাদিসের শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত, চাষাড়া, নারায়নগঞ্জ।

...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews