1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
ডলফিন: থামেনি হারিয়ে যাওয়ার মিছিল | অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ - Public Reaction
সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

ডলফিন: থামেনি হারিয়ে যাওয়ার মিছিল | অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ

  • প্রকাশ : বুধবার, ২০ মে, ২০২০
  • ৩৩০ বার

করোনা মহামারীতে যখন সারা দেশের মানুষ সন্ত্রস্ত, যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল, সবাই হয়ে পড়েছে গৃহবন্দী, তখন পত্র-পত্রিকায় খবর আসলো জনমানবহীন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের অদূরে সাগরে খেলা করছে বেশ কিছু ডলফিন।এরকম দৃশ্য শেষ কবে দেখা গিয়েছিল কারও মনে নেই। এটা ধারনা করা স্বাভাবিক যে, মানুষের উপস্থিতি না থাকায় এসব ডলফিন নিজেদেরকে অনেকটা নিরাপদ মনে করে প্রকৃতিতে তাদের জন্য নির্ধারিত যায়গায় বহুদিন বাদে এসেছিল ঘুরতে। কিন্তু বিধি বাম, অমানবিক মানুষ, প্রকৃতির এই সন্তানদের জলকেলী আর সহ্য করতে পারলনা। এর কয়েকদিন পরে কিছু পত্রিকায় খবর বের হলো টেকনাফের শাপলাপুর সমুদ্র সৈকতের কাছে জেলেরা একটি ডলফিনকে পিটিয়ে মেরে ফেলে রেখেছে।

বাংলাদেশের নদীগুলোতে এক সময় শুশুক নামে পরিচিত একধরনের ডলফিন হরহামেশা দেখা যেত।স্তন্যপায়ী এই প্রানী প্রায়শই নিঃশ্বাস নিতে পানির উপরি ভাগে উঠে আসে। এছাড়াও, মাছ শিকার করতে গিয়ে এরা সময় সময় পানির উপরিদেশে চলে আসে এবং খুব জোরে মুখ থেকে বাতাস নির্গমন করে এতে করে শরীরের কতক অংশ পানির উপরিভাগে দেখা যায়। কখনও দেখা যায় শুশুকের তাড়া খেয়ে মাছগুলো বাঁচার জন্য তার মুখের সামনেই লাফ দিচ্ছে। ছোটবেলায় দক্ষিন বাংলার নদীগুলোতে এমন দৃশ্য কত দেখেছি তার সীমা নাই।বছর দশেক আগেও যারা দেশের দক্ষিনাঞ্চলে লঞ্চ কিংবা ষ্টিমারে ভ্রমন করেছেন তারাও নিশ্চয়ই এরকম দৃশ্য দেখে থাকবেন। সময়ের পরিক্রমায় এসব কেবলই স্মৃতি। এখন নদীগুলো যে গতিতে নাব্যতা হারাচ্ছে তার চেয়েও বেশি গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে শুশুকের মত এসব নদীর ডলফিন।

ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি বাংলাদেশ এর দেয়া এক তথ্যমতে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দেশে ১০৮টি ডলফিন মারা পড়ে। এসবের মাঝে ৮০টি ছিল শুশুক ও বাকীগুলো ইরাবতী ডলফিন।এসব ডলফিনের মৃত্যুর কারন অনুসন্ধান করলে দেখা যায় অধিকাংশই জেলেদের ইলিশ ধরার জালে আটকে গেছে আর কিছু মারা গেছে নৌযানের ধাক্কার কারনে।অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে জেলেরা কোনো কারন ছাড়াই জালে আটকে পড়া ডলফিনদের পিটিয়ে মেরে ফেলছে এবং এনিয়ে আনন্দ করছে।ডলফিনের তেল সংগ্রহ এবং এর ব্যবহার নিয়েও আছে অনেক কুসংস্কার। আর এসব সংস্কার, কুসংস্কার, ব্যবহার, অপব্যবহারের বলি হচ্ছে প্রকৃতির নিরীহ এই প্রাণি।

আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলের নদীগুলোতে ডলফিনের জলকেলি ছিল একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। এখন জলকেলি না দেখা গেলেও এদের মরদেহ ভাসতে দেখার খবর পত্র পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাঝে মধ্যে দেখা যায়। সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নদীগুলোতে জেলেদের মাছ ধরা জালে প্রায়শই শুশুক ও ইরাবতী ডলফিন আটকে পড়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। ডলফিনের দাঁত ও পাখনা জালে জড়িয়ে পড়লে এরা এক পর্যায়ে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা পড়ে। একসময় ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি বাংলাদেশ এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কম লবনাক্ত পানিতে ২২৫টি শুশুকের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল কিন্তু ২০১৮ সালের আরেক জরিপে মাত্র ১৫৯টি শুশুকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ২০০৬ সালে পরিচালিত এক জরিপে ৪৫১টি ইরাবতী ডলফিনের খোঁজ মিললেও ২০১৯ সালে পূনরায় জরিপ চালালে এ সংখ্যাটি নেমে আসে ১৯৮টিতে।

ডলফিনের এভাবে হারিয়ে যাওয়ার পিছনে আরেক গুরুত্বপূর্ন কারন হলো পানির লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়া। গঙ্গা অববাহিকায় সচরাচর যে ডলফিন গুলো পাওয়া যায় তার মধ্যে গাঙ্গেয় ডলফিনের পরিচিতি বিশ্ব জোড়া। এই ডলফিনের বাস মূলত মিঠা পানিতে। কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলের জলাশয়গুলোতে দিন দিন লবনাক্ততার পরিমান বেড়ে যাচ্ছে। সুন্দরবনের ভারতীয় অঞ্চলে গাঙ্গেয় ডলফিনের উপস্থিতি নিরুপনের জন্য পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় নদীর যে এলাকায় পানির লবনাক্ততা ১০ পিপিটি’র বেশি সেখানে গাঙ্গেয় ডলফিনের দেখা মেলেনা। গবেষকদের ধারনা সুন্দরবনের পূর্ব ও মধ্য অঞ্চলে পানির লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারনে এদের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন, সমুদ্র তলের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় জলে লবনের পরিমান বেড়ে যাওয়ার ঘটনা এক সুতোয় গাঁথা। আর এর পিছনে রয়েছে মানুষের বিশাল কীর্তি। আমরা আমাদের আরাম আয়েস আর সমৃদ্ধির জন্য প্রকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করছি প্রতিদিন আর এর খেসারত দিচ্ছে নিরাপরাধ প্রাণিরা।

সুন্দরবন অঞ্চলের চাঁদপাই, ধংমারি ও দুধমুখি তিনটি নদীকে ২০১২ সালে বন্যপ্রানি অভয়ারণ্য ঘোষনা করা হয় মূলত মিঠাপানির ডলফিনকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। কিন্তু ধংমারী অভয়ারণ্যের কাছে প্রতিদিন যাতায়ত করছে পন্যবাহী জাহাজ আর হুমকি তৈরি করছে ডলফিনের বিচরন ও প্রজননের উপর। সুন্দরবনের বেশ কিছু অঞ্চলে বিষ দিয়ে মাছধরার কাজ করছে কিছু অসাধু লোক এবং এ বিষের কারনেও মৃত্যু ঘটছে অনেক ডলফিনের। সরকারি এক জরিপ বলছে, ডলফিনের মৃত্যুর কারন হিসেবে ৭০ ভাগ ঘটছে মাছ ধরার জালে, ৮ ভাগ বিষ দিয়ে মাছ ধরার কারনে, ৬ ভাগ মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া আর ৫ ভাগ নদীর তলদেশে পলল জমে গভীরতা কমে গিয়ে ডলফিনের আবাস বিপন্ন হওয়ার কারনে।

এতসব প্রাকৃতিক, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার কারনের সামনে সবচেয়ে ভয়ংকর কারন হিসেবে হাজির হচ্ছে আমাদের মত মানুষের অমানবিক কর্মকান্ড গুলো। হালদা নদী, দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মতস্য প্রজনন কেন্দ্র যার পরিচিতি দেশ পেড়িয়ে বিশ্বপরিমন্ডলেও। মা মাছের সাথে সাথে হালদা দীর্ঘদিন ধরে ডলফিনেরও এক অবাধ বিচরন ক্ষেত্র। প্রকৃতির অপার সৃষ্টি এই নদী যেখানে ডলফিনের স্বর্গভূমি হওয়ার কথা, সেখানে এটি যেন মৃত্যুকূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন খবর ও যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায় মৃত ডলফিনের লোমহর্ষক ছবি। বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যাচ্ছে উকড়ির ইউনিয়নের ছায়ারচর এলাকায় একটি ডলফিনকে কেটে ফেলে রাখা হয়েছে নদী তীরে। ধারনা করা হয় জেলেদের জালে আটকা পড়া ৫২ কেজি ওজনের ৫ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা ডলফিনটি জাল থেকে মুক্ত করার জন্য এর শরীর কেটে ফেলেছে জেলেরা।একই নদীতে চলতি বছরের মার্চ মাসে একটি ডলফিনের মৃতদেহ পাওয়া যায় এবং গতবছরের ডিসেম্বরে একই নদীর আজমীর ঘাট এলাকায় ৬ ফুট লম্বা ডলফিনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

হালদা নদী গবেষনার তথ্যমতে, বিশ্বে গাঙ্গেয় এবং ইরাবতী ডলফিন আছে ১২০০ যার মধ্যে ২৫০ টির উপস্থিতিতি রেকর্ড করা হয়েছে হালদা নদীতে।এই নদীতে ইঞ্জিন চালিত নৌকার প্রপেলারের আঘাতে ডলফিনের সাথে মা মাছ মারা যাওয়ার খবরও আসছে প্রায়ই।

সবমিলে বলা চলে ডলফিনের মৃত্যুর মিছিল দিনে দিনে লম্বা হচ্ছে।করোনাকালে যেখানে মানুষের কর্মকান্ড ও চলাচল সীমিত হয়ে পড়ার কারনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রকৃতি নিজস্বতা ফিরে পাচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে সেখানে এদেশে কিছু অবিবেচক মানুষের হাতে হরহামেশা খুন হচ্ছে হারিয়ে যেতে বসা প্রকৃতির সন্তান এই নিরীহ প্রাণী ডলফিন।জলজ বাস্তুসংস্থানের অপূর্ব এই সদস্য যেমন নান্দনিকতার একটি কারন তেমনি বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায়ও এর রয়েছে ব্যাপক অবদান। বিভিন্ন জীবের উপস্থিতি কত তা মূলত কোন বাস্তুসংস্থান কতটা সুস্থ তা নির্দেশ করে। দিন দিন এভাবে ডলফিন হারিয়ে গেলে জলজ বাস্তুসংস্থানের খাদ্য জাল তার ধারাবাহিকতা হারাবে আর একদিন প্রকৃতিতে পড়বে তার বিরূপ প্রভাব। আমরা সকলেই তো এই প্রকৃতির সদস্য। তাই প্রকৃতি অসুস্থ হলে আমরা কি ভালো থাকতে পারব?

লেখক: অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল।
saifullahasm@yahoo.com

...

2 responses to “ডলফিন: থামেনি হারিয়ে যাওয়ার মিছিল | অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ”

  1. Prof. Dr. Md. Shafiqul Islam says:

    Really informative. May be helpful for creating awareness among mass people.

  2. Saifullah says:

    Thank you professor

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews