1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ০৫:৩১ অপরাহ্ন

পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে মৎস্য সেক্টরে গুরুত্বারোপ প্রয়োজন | মো. ইউসুফ আলী

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০
  • ১৬৫ বার

মহামারী করোনায় সারাবিশ্ব এখন কোণঠাসা। জনজীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। করোনা প্রতিরোধে সারা বিশ্বে এখন চলছে লকডাউন। বর্তমানে বিশ্বে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ এবং মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশেও দুই মাস টানা লকডাউন থাকার পর স্বল্প পরিসরে খুলতে যাচ্ছে বন্দিদশা। করোনাকালে জরুরি সেবা দানকারি দপ্তরের পাশাপাশি মাছের উৎপাদন ধরে রেখে দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিতে করোনা পরিস্থিতিতে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে নিজেদের কার্যক্রম চলমান রেখেছিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মৎস্য অধিদপ্তর।

আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। প্রাচীনকাল থেকেই মাছ বাঙালির কাছে স্বাদ ও সাধের খাবার। তাই সরকার সর্বদায় এই মৎস্য খাতকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে। গুরুত্বের সেই প্রমাণস্বরূপ বাংলাদেশ আজ মাছ চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে, মাছের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টনের বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৪২ লাখ ৭৭ হাজার মেট্রিক টন। দেশের জিডিপির ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপি’র প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি (২৫.৭১%) মৎস্য খাতের অবদান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৬ এর তথ্য মতে, আমাদের প্রয়োজনীয় আমিষের ৫৫% পাই মৎস্য খাত থেকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য আহরণে ৩য় এবং চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। খাদ্যনীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) বলছে, পুকুরে মাছ চাষে সারা বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। তারা অভূতপূর্ব এ ঘটনাকে ইফপ্রি ‘নীল বিপ্লব’ বলে উল্লেখ করেছে। গত ৩৪ বছরে শুধু পুকুরে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ১২ গুণের বেশি। দেশের প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এখন মাছ চাষ এবং এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে আসছে এই মৎস্য খাত। দেশের দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে এই খাতের অবদান শীর্ষ তিনের মধ্যে রয়েছে। আর কর্মক্ষম মানুষের ২৩ শতাংশ এখন কোনো না কোনোভাবে মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ ১৯৯০ সালে ছিল বছরে সাড়ে ৭ কেজি, এখন তা ৩০ কেজি।

মাছের উৎপাদন ধরে রেখে দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিতে করোনাকালে মৎস্য ভবনের প্রধান কার্যালয়সহ দেশের সকল বিভাগ, জেলা ও উপজেলার অফিসগুলো স্বল্প পরিসরে খোলা রাখা হয়। মৎস্য রপ্তানির ধারাবাহিকতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কুয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স ল্যাব, সামুদ্রিক জরিপ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সামুদ্রিক দপ্তর তাদের কার্যক্রম চলমান রেখেছে। বাৎসরিক কর্মপরিল্পনা পূরণে দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি মাছ, পোনা ও মৎস্য খাদ্য পরিবহণে সমস্যা দূরীকরণে জেলা ও উপজেলা অফিস কঠোর তদারকি ও প্রত্যয়ন প্রদান করেছেন। ফলে পরিবহন সমস্যা দূরীভূত হয়। করোনাকালে সরকারের ত্রাণ সহায়তা জনগণের দৌঁরগোড়ায় পৌঁছে দিতে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে আসছে জেলা ও উপজেলা মৎস্য দপ্তর। মৎস্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকে দেশের সকল দপ্তরকে সহায়তায় কন্ট্রোলরুম স্থাপনের পাশাপাশি সর্বোক্ষনিক যোগাযোগ রাখা হয়েছে।

বর্তমানে জাটকা নিধন বন্ধে নদীতে চলমান রয়েছে অভিযান। জাটকা নিধন বন্ধে মৎস্যজীবীদের জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত বিশেষ মানবিক সহায়তা (ভিজিএফ) প্রদানের কাজও করে যাচ্ছে কর্মকর্তারা। মৎস্য চাষিদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং দারিদ্র্য জনগোষ্ঠির পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিত করতে ত্রাণের সাথে মাছ বিতরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ মাছের প্রধান প্রজনন মৌসুম চলায় খামার-হ্যাচারীগুলোতে রেণু পোনা উৎপাদন কার্যক্রম চলমান। করোনায় মানুষ বন্দিদশায় থাকায় মাছের দাম নিন্মমুখি হবার আশঙ্কা দেখা দিলে মানুষের দৌঁড়গোড়ায় মাছ পৌঁছে দিতে অধিদপ্তর স্থাপন করে ভ্রাম্যমান মাছ বিক্রয় কেন্দ্র। ফলে অনলাইন, ফোনকল ও স্থানীয় মৎস্য অফিসের ফেসবুকে মেসেজের মাধ্যমে সহজে ফরমালিনমুক্ত মাছ ক্রয় করতে পারছেন ভোক্তারা। এতে মৎস্য চাষিদের নায্যমূল্য নিশ্চিতের পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে। প্রান্তিক চিংড়ি চাষিরা যাতে ক্ষতির সম্মুখিন না হয় সে লক্ষ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে ডিপোগুলো খোলা ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও মাছ ও চিংড়ির পোনায় সাময়িক সংকট দেখা দিলে হ্যাচারী ও খামার ব্যবস্থাপকদের মোবাইল কিংবা অনলাইনে অর্ডার দিলে পোনা/পিএল সরাসরি চাষিদের পুকুর ও ঘেরে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্টগুলো সাথে কয়েকদফা আলোচনা করা হলে চাষিদের কাছ থেকে নায্যমূলে চিংড়ি কিনে সংরক্ষণ করার প্রতিশ্রতি দেন প্লান্ট মালিকরা।

মৎস্য আড়ৎ তদারকি

ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক চাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে প্রণোদনা, স্বল্পসুদে ঋণ, টেকনিক্যাল সাপোর্ট নিশ্চিতে অধিদপ্তর কর্তৃক ক্ষতি নিরূপণ করা এবং চাষিদের তালিকা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। এদিকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে (হার্ড ইমোউনিটি) ইতোমধ্যে লকডাউন তুলে নিয়ে চলাচলে সিথিল করা হচ্ছে। মানব দেহের গঠন ও ক্ষয় পূরণের প্রধান উপাদান প্রাণিজ আমিষের নিরাপদ উৎস মাছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপাদান ভিটামিন, মিনারেল, উপকারী ফ্যাট (ওমেগা ৩) রয়েছে। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে তাই বেশি বেশি মাছ খেতে প্রচারণা করছে দপ্তরটি।

করোনাকালে জণজীবন বিভিন্নভাবে বিপন্ন হলেও সবচেয়ে আশার বিষয় হলো মৎস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধন করতে পারেনি। সেক্টরটির উৎপাদন থেকে শুরু করে খাবার টেবিলে পৌঁছানো পর্যন্ত যথেষ্ট পরিকল্পনা বিদ্যমান রয়েছে। মৎস্য ও প্রানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে উপরোক্ত পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে প্রাথমিক ধাক্কায় সমস্যা কাটিয়ে উঠা অনেকটাই সহজ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

তবে সেক্টরটিতে সবচেয়ে যে বিষয়টি চিন্তার তা হলো মৎস্য ও চিংড়িজাত পণ্য রপ্তানি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৫০টির বেশি দেশে প্রায় ৬৮ হাজার ৯৩৬ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্য পণ্য রপ্তানি করে রাজস্ব অর্জিত হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। চিংড়ি রপ্তানী মূল্য স্থান ইউরোপ ও আমেরিকা হওয়ায় করোনার পরিস্থিতিতে এই সেক্টরটির রপ্তানি অনেকটাই থমকে আছে। এক্সপোর্ট এসোসিয়েশনগুলো এতোমধ্যে যে তথ্য দিয়েছে তাতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার চিংড়ির ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কিংবা নতুন বাজার সুষ্টি না হলে দেশকে একটা বড় রাজস্ব হারাতে হতে পারে। যদিও মৎস্য ও চিংড়ি রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে তথাপি মৎস্য ও চিংড়ি চাষিরা যাতে আগ্রহ না হারায় সেজন্য বাংলাদেশ সরকার যে ৫ হাজার কোটি টাকার স্কীম ঘোষণা করেছে, তা থেকে তারা অল্প সুদে প্রণোদনা পেতে পারে। তারপরও নিরাপদ আমিষের এই উৎসকে আরো সামনে এগিয়ে নিতে এই খাতকে কৃষির মতই জরুরি সেবা ঘোষণা করে এই সেক্টরের চলমান প্রকল্পের অর্থায়ন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

লেখক: উপসহকারী পরিচালক (৩৭তম বিসিএস), মৎস্য অধিদপ্তর, বাগেরহাট।

...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews