1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
সজল শ্যাম ঘন বরষা | ইমরুল কায়েস - Public Reaction
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:০৫ অপরাহ্ন

সজল শ্যাম ঘন বরষা | ইমরুল কায়েস

  • প্রকাশ : রবিবার, ১৪ জুন, ২০২০
  • ২৪৯ বার

রূপসী বাংলার কবি কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন, ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। বৃষ্টি ঝেপে আসুক বা ঝিরঝিরে নামুক, আজ পহেলা আষাঢ়। যেমন করে বিশ্বকবি তার আবেগময় গানে বর্ষাকে নৈবদ্য দেয় কদম ফুলে- ‘বাদল দিনের প্রথম কদমফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।’ আজ আষাঢ়স্য প্রথম দিবস। নূতন সাজে বহুরূপে পালাবদলের পরিক্রমায় গ্রীষ্মের শেষে আগমন ঘটে বর্ষার। ঋতুচক্রে বর্ষার স্থান দ্বিতীয়। ছয়টি ঋতুকে কেন্দ্র করেই প্রকৃতি তার রূপ, যৌবন যেন বদলে নেয়। ষড়ঋতুর আলিঙ্গনে রুপসী বাংলার প্রকৃতি হয়ে উঠে সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার-‘দ্রৌপদী’। কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি, বা রংধনু, কখনো সূর্যের অতীব তীব্র কিরণ! সবই যেন প্রকৃতির লীলাখেলা।

দুই মাসের সহমিলনে আবিভূর্ত হয় একেকটি ঋতু। তেমন করে আষাঢ়-শ্রাবণে বাংলার প্রকৃতির মাঝে মনোহর রূপে আগমন করে ঋতু রাণী-বর্ষা ষড়ঋতুর লীলার মাঝে বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বর্ষায় প্রকৃতি উর্বরা হয়—নব নব বৃষ্টির জলে স্নান করে গত বছরের সকল দূষণকে পুত করে সাজে স্নিগ্ধ লাবণ্যে। তাই বর্ষা লগনে চির রোমান্টিক কবি রবিন্দ্রনাথ গেয়ে উঠতেন—‘আজি ঝড়ো ঝড়ো মুখোরো বাদলো দিনে/ জানি নে, জানি নে/ কিছুতে কেন যে মন লাগে না…’।

কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বর্ষার আকাশকে প্রকাশ করেছেন- ‘শ্রান্ত বরষা, অবেলায় অবসরে প্রাঙ্গণে মেলে দিয়েছে শ্যামল কায়া; স্বর্ণ সুযোগে লুকোচুরি খেলা করে গগনে গগনে পলাতক আলো-ছায়া।’ বর্ষায় আকাশের রঙ-রূপ বৈচিত্র্যে ভরপুর থাকে। আকাশে যেন বিভিন্ন বর্ণের মেঘের খেলা চলে। দিগন্ত বিস্তৃত ধূসর কৃষ্ণ মেঘপুঞ্জের ঘনঘটা সবাইকে মুগ্ধ করে, কাছে টানে অন্য এক অজানা আকর্ষণে। চারপাশের ঘন কালো মেঘের বাদ্য-বাজনার তালে তালে বৃষ্টির লীলা-নৃত্যে নিরাবেগী যে কেউ অতিশয় আবেগী হয়ে গুনগুন করে উঠে—‘রিমঝিম বৃষ্টিরো ছন্দে মন আজি উছলে উঠে অজানা আনন্দে’। রিমঝিম বৃষ্টির মিষ্টিমাখা সুর শুনতে কার না ভালো লাগে। বর্ষার দিনে টিনের চালে ঝাপুর ঝুপুর, গাছের ডালে টাপুর টুপুর, পুকুর জলে রিনিঝিনি বৃষ্টির ছন্দে উদাস হয় মন। দলবেঁধে ডেকে ওঠে কোলাব্যাঙ- মেঘ হ মেঘ হ, নবজীবনের আনন্দমেলা শুরু হয়। ঝুমুর ঝুমুর বিষ্টিতে ক্ষেত-পাথার ডুবে যায়। টইটম্বুর পানিতে ঢেউ ওঠে ছলাত্ ছলাত্। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। যেন নতুন সমুদ্র জেগেছে গ্রামজুড়ে। দুষ্টু ছেলেরা কলাগাছ কেটে ভেলা বানায়। কলার ভেলায় চড়ে আনন্দে মেতে ওঠে দুরন্ত কিশোরের দল। ঝাঁপ দেয় পানিতে, ডুব সাঁতারে হার মানায় পানকৌড়িকেও। ছোট ছোট খাল-বিলে শাপলা ফুটে হাসতে থাকে। ছেলেমেয়েরা শালুক কুড়ায় ডুবিয়ে আর শাপলা তুলে নৌকায় করে। বৃষ্টি ঝরে হাটে-মাঠে-নদী ও পাহাড়ে। হেসে ওঠে সবুজরঙা গাছপালা, পুকুর জলে টুপ টুপ ডুব দিয়ে আনন্দে খেলা করে হাঁসের ছানা। মাছেরা ছুটে বেড়ায় বৃষ্টির নতুন পানিতে। লাঙল কাঁধে চাষি পা বাড়ান ক্ষেতের দিকে। নরম মাটিতে হাল দেন। আউশের চারা লাগান। জেলেরা জাল ফেলে নদীতে। জাল ভরে উঠে আসে নানা রূপোলি মাছ।

বর্ষা ঋতু যেন ফুলের জননী। বর্ষা ও তার ফুল যেন বাংলার প্রকৃতির আত্মা। বৃষ্টিস্নাত ফুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের মন রাঙিয়ে দেয়। বর্ষার যে ফুলগুলো আমাদের আকৃষ্ট করে- শাপলা, কেয়া, কলাবতী, পদ্ম, দোলনচাঁপা, চন্দ্রপ্রভা, ঘাসফল, পানাফুল, কলমি ফুল, কচুফুল, ঝিঙেফুল, কুমড়াফুল, হেলেঞ্চাফুল, কেশরদাম, পানিমরিচ, পাতা শেওলা, কাঁচকলা, পাটফুল, বনতুলসী, ক্যাজুপুট, গগনশিরীষ, নাগেশ্বর, মিনজিরি, সেগুন, সুলতান চাঁপা, স্বর্নচাঁপা নলখাগড়া, ফণীমনসা, উলটকম্বল, কেওড়া, গোলপাতা, শিয়ালকাঁটা, কেন্দার, কামিনী, রঙ্গন, অলকানন্দ, বকুল এবং এ ছাড়া নানা রঙের অর্কিড। পুকুর পাড়ে কদম গাছে ফুটে থাকে কদম ফুল। কদমের পাতাগুলো যেমন সুন্দর ফুলগুলোও তেমনি আকর্ষণীয়। এছাড়া বাহারী জবা ফুলতো আছেই।

বর্ষণ মুখর প্রকৃতি হৃদয়ে শিহরণ যোগায় প্রেমিক মন ও জেগে ওঠে। তরুণ-তরুণীদের হৃদয়ে ও বর্ষা যেন নতুন মাত্রা যোগ করে তা এ গানটি শুনলেই উপলদ্ধি করা যায়, ‘শ্রাবণের মেঘগুলো ঝড়ো হলো আকাশে,অঝরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝড়ায়ে/আজ কেন মন উদাসী হয়ে, দূর অজানায় চায় হারাতে।’ হুমায়ূন আহমেদও গেয়েছেন—‘যদি মন কাঁদে চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়…।’

বর্ষার ফল করমচা, পানিফল। বৃষ্টিভেজা করমচা ফল, পাতা ও গাছ দেখতে সত্যিই খুব সুন্দর। বর্ষাকালের ফলগুলো পুষ্টিগুণে ভরা থাকে। পেয়ারা, লটকন, আমড়া, জাম্বুরা, জামরুল, ডেউয়া, কামরাঙা, কাউ, গাব ইত্যাদি বর্ষার ফল।

‘নাইয়র’ গ্রাম্য বধূদের বাপের বাড়ি যাওয়ার উত্সব এই বর্ষাতে হয়— উদাস করা পল্লীবধূ নৌকায় ঘোমটা পরা রাঙামুখ টেনে ছই নৌকায় বাপের বাড়ি নাইয়র যায়। আর ফিরে ফিরে চায় ফেলে আসা পথ পানে। পাল তোলা নৌকা কল কল করে চলতে থাকে আপন মনে।
আষাঢ়-শ্রাবণ মাস জুড়েই নৌকা বাইচের আয়োজন হয়। নৌকাগুলোকে লোকশিল্পের মোটিফ দিয়ে চিত্রিত করা হয় এবং রঙিন কাগজের সাহয্যে চমত্কার করে সাজানো হয়। বাইচের সওয়ারীদের সাজ-সজ্জাও দেখার মতো। নৌকার মাঝখানে দাঁড়ানো মূল গায়েন হাতে রঙিন রুমাল, পায়ে ঘুঙ্ঘুর, কাঁধে থাকে গেরুয়া রঙের উত্তরীয় বেঁধে উত্সাহমূলক লোকগীতি গাইতে থাকেন-‘কোন মিস্তরি নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়?/ ঝিলমিল ঝিলমিল করে আমার ময়ূরপঙ্খি নাও’। নৌকার গতির সাথে তাল মিলিয়ে নদীর পাড় ধরে ছুটতে থাকে শিশু-কিশোরের দল। নৌকার গতি অনুসারে অনেকে নৌকার সুন্দর সুন্দর নাম—ঝড়ের পাখি, পঙ্খিরাজ, সাইমুন, তুফান মেল, ময়ূরপঙ্খি, অগ্রদূত, দীপরাজ, সোনার তরী ইত্যাদি।

হাওর অঞ্চল পানিতে ফুলে ফেঁপে যেন সাগর—যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কয়েক গ্রাম মিলে আয়োজন করে যাত্রাপালা—সিরাজ-উদ-দৌলা, সোহরাব-রুস্তম, বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর, রূপবান ছাড়াও ভাটি অঞ্চলে মনসার ভাসান নিয়ে গীত পরিবেশনের আসর বসে রাতের বেলা কোন কৃষকের বাড়ির উঠোনে। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম বলেন—‘বর্ষা যখন আইতো, গাজির গান হইতো, রঙে ঢঙে গাইতো আনন্দ পাইতাম।’ এভাবে বর্ষার সাথে সারা বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মিশে রয়েছে।

গ্রামের নারীদের সৃজনশীলতার উত্সবের অন্যতম সময় এই বর্ষাকাল। সেলাইয়ের ফোঁড়ে, ফোঁড়ে পুরনো কাপড়ের পরতে পরতে উঠে আসতে জীবনের কথকতা। সুঁচ আর হাতের জাদুতে হেসে ওঠে সুন্দর সুন্দর নকশীকাঁথা; মনের কল্পনাগুলো ছড়িয়ে দেন নকশীকাঁথায়। এটিও বাংলাদেশের বর্ষার উত্সবের একটা অত্যন্ত প্রাণময় এবং বর্ণিল অংশ।

পুঁথিপাঠ ও গল্পের আসর বসে দলিজায় ও বৈঠকখানায় সাথে থাকে— চালভাজা ও মুড়ি-মুড়কি। এ সময় দাদিরা গল্পের ঝুলি খোলেন। ছোটদের জড়ো করে রূপকথার রাজ্য, দৈত্য-দানব-ডাইনী বুড়ি আর রাক্ষসের গল্প শোনান কেউ কেউ।

বর্ষার উত্সবের সাথে যুক্ত হয় রকমারী মুখরোচক সব খাবার—সুগন্ধী চিনিগুড়ি চালের ভুনা খিচুড়ির সাথে কলাপাতায় মোড়ানো পদ্মার ভাপা ইলিশ, সরষে- বাটা ইলিশ, কাঁচা তেঁতুল দিয়ে নতুন বর্ষার জলের চক্চকে চেলা অথবা পাবদা মাছের ঝোল, শেষ পাতে পায়েস অথবা চন্দ্রপুলী পিঠা! শহুরে সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে প্রিয়জনের সঙ্গে বসে গরম গরম খিচুড়ি আর মাংস ভুনা খাওয়ার আনন্দও ঘটে এই বর্ষায়।
গ্রামের মতো শহরে বর্ষার সৌন্দর্য খুব একটা ফুটে ওঠে না। তবুও ইট-পাথরে ঘেরা শহুরে লোকজনও বর্ষার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঝুম বৃষ্টিতে কেউ কেউ গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যায় বর্ষার পরশ পেতে। কেউ ছাদে উঠে বৃষ্টির ছোঁয়া নিয়ে জুড়িয়ে নেয় দেহ-মন। যান্¿িক শহুরে জীবনে বর্ষাকে কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ আসে না। শোনা যায় না সেই টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার রিমঝিম শব্দ। তবু ভীষণ রৌদ্রে পোড়া পিচঢালা পথ যখন ভিজে যায় শান্তির বর্ষায়, সেই রূপও সাধারণ নয়! শহরের মানুষরা বর্ষার রূপ উপলব্ধি করতে পারি বা না পারি, বর্ষা ঠিকই আসে তার রূপের ডালি সাজিয়ে। বর্ষায় ধুয়ে যায় শহরের ময়লা-আবর্জনা। ধুয়ে যায় জীবনের শত ক্লান্তি। প্রশান্তিতে ভরে ওঠে মন।

বর্ষায় কিছুটা বিপদের ঝুঁকিও রয়েছে। ভারি বর্ষণ পাহাড়ি ঢলে ভেসে যেতে পারে গ্রামের পর গ্রাম। ভেসে যেতে পারে বেড়িবাঁধ, মাছের ঘের। সে কারণে বন্যাপ্রবণ সমতল এলাকার মানুষ আতঙ্কে পার করে বর্ষাকাল। তলিয়ে যায় আবাদি ফসলের জমি। অতিবৃষ্টির কারণে শহুরে নাগরিকের রয়েছে জলাবদ্ধতার শিকার হওয়ার ঝামেলা। দিনমজুর; বস্তিতে থাকা মানুষদেরও কাজ-কর্ম বন্ধ হয়ে যায়। কর্মজীবীরা বৃষ্টি উপেক্ষা করে ছুটে যান কর্মস্থলে। কিছু বিপদের কথা বাদ দিলে সব মিলিয়েই বর্ষা নিয়ে আসে স্বস্তি ও শান্তির অনুভূতি। ফুলে ফলে কিংবা বৃক্ষজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অপরূপ প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য।

কবিদের ভাবনায় বর্ষা এক অনিন্দ্য সুন্দর সৃষ্টি। বাংলাসাহিত্যের কবি-সাহিত্যিক সবাই বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যে মোহিত ও মুগ্ধ—বৃষ্টির মিষ্টি সুরে রচিত হয়েছে শত শত ছড়া, কবিতা, গান ও গল্প। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মা নদীর মাঝি, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী, জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে বা হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’- এ বর্ষা অনবদ্য। নজরুলও বলেছিলেন—‘রিমঝিম রিমঝিম ঘন দেয়া বরষে/…/কুহু পাপিয়া ময়ুর বোলে/ মনের বনের মুকুল খোলে/ নট-শ্যাম সুন্দর মেঘ পরশে।’ বর্ষার অপরুপ প্রকৃতি সব কিছুকে ছাপিয়ে একে করে তোলে মানবিক এবং সার্বজনীন ঋতু।

জুন ১০,.২০২০, শ্যামলী, ঢাকা।

লেখক: গল্পকার ও সরকারি কর্মকর্তা।

...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews