1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
লাল নিশান | ইমরুল কায়েস - Public Reaction
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২০, ০৮:২৫ অপরাহ্ন

লাল নিশান | ইমরুল কায়েস

  • প্রকাশ : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০
  • ১২১ বার

ও হো রে! জোরে শব্দ করে উঠল ছবির উদ্দিন।
চিরপরিচিত বাল্যসখী দুধকুমারীর ঘাটে এসে দাঁড়াতে হাত থেকে প্যাকেটে মোড়ানো বিশেষ ব্যাগটি কাদায় পড়ে গেছে। আপসোস করতে করতে হাতের লাগেজ ট্রলিটি দূরে ঘাসের উপর রেখে; এবরো থ্যাবরো কাদা থেকে হাতের পরে যাওয়া ব্যাগটি তুলে নিলো ছবির উদ্দিন।

দুধকুমারীর একি হাল! মাথার উপরে রাতের মুক্ত আকাশ; নবমীর ভরা চাঁদের মতো আলো উছলে পড়ছে নদীর জলে কিন্তু জল এতো কম যে – ইচ্ছে করছে এক লাফে সাঁতরিয়ে যায়। ছেলেবেলার বন্ধু – এই দুধকুমারীর সাথে জড়িয়ে আছে কত শত ছোট বড় নিবিড় সখ্যতার গল্প।

বাড়ির কাছে এসে এমন রাতে নৌকার জন্য আর কতো অপেক্ষা! নদীর মাঝ দিয়ে কোন রকম করে ছোট নৌকা চলতে পারে। অগ্রহায়ণ মাসের এমন জ্যোৎস্না শোভিত তুলতুলে আকাশ দীর্ঘ পাঁচ বছরের পরবাসে ছবির উদ্দিন কোন দিন দেখেনি!

আকাশ তো জাপানেও দেখেছে সে; সেই আকাশ কেন তাঁকে এমন করে নিমিষেই সুখের উত্তাল সাগরে ভাসিয়ে নেয়নি! আসলে কি? নিজের দেশের আকাশটাও নিজেরই। একই আকাশ কিন্তু এমন আপন না!

এই ঘাট আর বাড়ির গেট একই কথা ছবিরের কাছে। ওপার থেকে কখন যাত্রী আসবে! আগে তো হারাধন কাকা নৌকা বাইতো। এখন যে কে বায়? এমনিতেই ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে শুরু হয়েছে করোনার যন্ত্রণা। ঢাকায় নামার পর বাড়ি আসতে তার সতের দিন লেগে গেল। আশকোনা হজ¦ ক্যাম্পের পনের দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারিন্টিন। এখানে মন তার যতটা বিষিয়ে উঠেছে দীর্ঘ পাাঁচবছরের প্রবাস জীবনে এমন হয়নি। যা এই দুই সপ্তাহে বেশি তিতিয়ে উঠেছে। মনে মনে করোনাকে হাজার-লক্ষ-কোটিবার গালি দিয়েছে। নিজের দেশে এমন অবহেলা, অযতœ আর নাস্তানাবুদ হতে হবে ভাবতেই পারেনি!
আকাশে সুন্দর চাঁদটা আছে; না হলে নিজ গাঁয়ের ঘাটে এসে এমন দাঁড়িয়ে থাকা আর অন্ধকার থাকলে কি যে হতো?

কাদামাখা ব্যাগটি নেড়েচেড়ে দেখে – বউয়ের জন্য ভিতরে আছে জাপানি র্স্মাট মোবাইল, চব্বিশ ক্যারেটের সোনার চেইন, গলার হাড়, চুড়ি আর কানের দুল। সেই যাত্রা পথ থেকে ব্যাগটি হাতে হাতে রেখেছে ছবির। কাদামাখা ব্যাগ বউ কি ভাববে! বুঝিয়ে বললে হবে এখন। বিয়ের ফিরতি বছরে সে বিদেশে চলে গিয়েছিলো। বউয়ের পেটে রেখে যাওয়া বাচ্চার বয়স এখন চার বছর।

করোনার জন্য গাড়ি ঘোড়া কম থাকায় সময় মত ফেরী পায়নি। নদী পথে মাদারীপুরের কুসুমপুরের চরে আসতে প্রায় রাত দশটা! নৌকা কাছে আসতে দেখে -হারাধন কাকা বৈঠা ধরে আর যাত্রী বলতে তারই বাল্য বন্ধু করিম।

করিম নৌকা থেকে নামতে নামতে বলে -আরে দোস্ত! তুই এতো রাইতে?

– তোর না দুই দিন আগে আসার কথা ছিল? ভাবী বলল; -ঝুমকা… ভাবী তো কিছু কইল না!

– ফোন দিলে আমি তোকে নিয়ে আইতাম; -নারে, দেশে নামার পর মনডা খারাপ হইয়া গেল তাই;

ছবির মনে মনে ভাবে – বিদেশ থেকে শ্রমিক হিসেবে দেশে ফেরত আইলে তহন বুঝতি। বিদেশে তাও এট্টু মান সম্মান জোটে এখানে তার সিকি আধুঁলি নাই। ছবির বলে যাই হোক –
-তুই কই থাইকা রাইতের বেলা?

-আরে ক্ইসনা সেই কথা; ঝুমকা (বলতে গিয়ে ঢোক গিলে বলে) ভাবী মোবাইল করে কইলো আম্মার ইনসুলিন নাই; তাই…।

– দোস্ত সকালে যামু নি, আমার জন্য কিছু আনলে রাইখ্যা দিস। ভাবীর কাছ থেকে নিবো এখন।
ছবির উদ্দিন দেশ, বিদেশ ঘোরা লোক। একটু খটকা লাগলো। ঠিক হয়ে বলল – -কাকা ভালা আছেন? -হ বাপু ভালা; -কাকীমা, নরেন, শিবানি ওরা সবাই আছে তো? -হুম, বলে হারাধন একমনে বৈঠা ধরে নৌকা বায়।

ছবিরের মনে অন্য ভাবনা। নদীর পানি কম মনে হলেও চোরা ঢেউয়ের কড়া ধাক্কা এসে লাগল; নৌকা দুলে উঠল!
দুধকুমারীর এপারে মাত্র তিন ঘর লোকের বাস। শেষের বাড়িটা হারাধন মাঝির। ঘাট থেকে আধমাইল পায়ে হাঁটা পথ।
নৌকা থেকে ছবির নামল। হারাধন মাঝি বলল –
-বাপু, দাঁড়াও নৌকাটা বাধিঁ আসি;

-আচ্ছা কাকা, আইসেন;

দুজনে পাশাপাশি হাঁটে আর গ্রামের ঘটে যাওয়া যত রকমের ঘটনা সব শোনে হারাধনের মুখে। এতোদিন কেন বিদ্যুত আসেনি চড়ক পরা গাছের মতো খালি খাম্বা দাঁড়িয়ে আছে! ঘাট নিয়ে কারা করা তদবির করছে; মেম্বার চেয়ারম্যান কি করলো? কার পোলা কার মাইয়্যা ভাগলো, কার নতুন বউ বিষ খেয়েছে; কার সাথে ফুসুর ফাসুর এমন ইত্যকার হাজারো কথা নিমিষেই হারাধন বলে যাচ্ছে -যেন বলতে পারলে পেট ফোলা ব্যারাম থেকে বেঁচে যায়। এমন যে -পেট খালি হলে শান্তি! অনেক দিন পরে গ্রামে আসছে ছবির; তার শুনতে ভালো লাগছে। সে জোগাড় দিয়ে তাল মিলাচ্ছে হাঁ – কাকা, হু কাকা, হ কাকা, তারপর কি হলো? এমন শব্দ উচ্চারণ করে।

বউদের পর পুরুষের সাথে কথা আসলে হারাধন থেমে বলে –
-বাবা ছবির উদ্দি, তুমার ওপরে আবার করোনা মায়ের কু নজর পড়ে নি তো?

-না; না কাকা; আমি তো পনের দিন কোয়ারিন্টিনে থাইক্যা এরপর আইলাম;

-করোনা মরোনা হয় নি;

-বাপু সাবধানের মাইর নাইক্যা, ওপারের গণেশের বাড়ি, মোল্লা বাড়ি ম্যাজিস্ট্রেট আইয়া লাল পতাকা দিছে;

-ওহ, বলে ছবির বাড়িতে ঢুকে পড়ল।

পরের দিন সকালে ছবির দেখে – করিম এসে হাজির!

– দোস্ত কি কি আনলা? -ঝুমকা ভাবী? ও ভাবী কই গেলেন?

করিমের গলা শুনে ঝুমকা রান্না ঘর থেকে দৌড়ে আসলো। মুখে চিকন মুচকি হাসি – শোয়ার ঘর থেকে গলায় চেইন পরে; দ্রুত চুড়ি, দুল পরে হাতে নতুন জাপানি মোবাইল নিয়ে বের হয়ে আসে।

কই রাতে তো বিছানায় যাওয়ার সময় এগুলি কিছু পরে নি; কোন সাজগোছ করেনি? যে কাপড় পড়া ছিল ওই ছিল! ছবির মনে মনে পাটিগণিত ও বীজগণিতের সূত্র মেলায়!

ওই রাতেই ছবির ঘর থেকে একা চুপি চুপি বের হয়। হাতের পলিথিনের ব্যাগ থেকে চারটি লাল বড় পতাকা বের করে বাড়ির চার কোনার বড় গাছের মগডালে বাশঁদিয়ে টানিয়ে দেয়।

দুধকুমারীর মাঝে হারাধন মাঝির নৌকায় বসে করিম দেখল -ছবির উদ্দিনের বাড়িতে লাল নিশান পতপত করে উড়ছে।
-ও হারাধন কাকা, এবার তোমাদির বাঁচন নাই!

-ওই দ্যাখো ছবিরের বাড়িতে কি?

– নৌকা ঘুরাও কাকা; -হারাধন মাঝি লাল পতাকার বাতাসে উড়ার এপিঠ ওপিঠ দেখে হা -করে।

রঙ্গীণ টিনের ঘরের বারান্দায় বসে ছবির উদ্দিন ছেলেকে আদর করছে আর ঝুমকা বিবিকে দেখছে -তার গলা, হাত, কান সব খালি! জোরে জোরে শব্দ করে বাসন মাঁজছে…।

ছবির মুচকি হাসে; লাল নিশানা মনের সুখে উড়ছে।

লেখক: গল্পকার ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
ইমেইল: ikayesnbr@yahoo.com

...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews