1. hasanf14@gmail.com : admin : Hasan Mahamud
দক্ষতা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় উন্নতি | নুসরাত ইমরোজ হৃদিতা - Public Reaction
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:২৪ অপরাহ্ন

দক্ষতা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় উন্নতি | নুসরাত ইমরোজ হৃদিতা

  • প্রকাশ : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২০
  • ২৭৭ বার

আমাদের চিরচেনা চিকিৎসা কার্যপ্রণালীর কিছু কিছু নিয়মবিধি পরিবর্তন করাটা অতি জরুরী।শুধুমাত্র সেসব পরিবর্তনের অভাবেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এতটা পিছিয়ে আছে। আর এসব পরিবর্তন কার্যকর করতে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমার পরিবার নিউ ইয়র্কে অবস্থান করার সুবাধে সেখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করার সৌভাগ্য জুটেছে। সেখানকার নিয়মাবলী, চিকিৎসা ধাপ এবং সুযোগ-সুবিধাসমূহ যত দেখেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি। সেসব নিয়ে কিছুটা আলোচনা করছি।

১.প্রথমে যে কোনো ডাক্তারের এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার জন্য হয়রানীর কোনো অবকাশ নেই। গুগলে খোঁজ করলেই সেই ডাক্তারের পুরো পরিচিতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চেম্বারের ঠিকানা, রোগী দেখার দিন ও তারিখসমূহ এবং এ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য যোগাযোগ করার ফোন নাম্বার পাওয়া যায়। সেই নাম্বারে যোগাযোগ করেই ডাক্তারের অভ্যর্তকের মাধ্যমে এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া যায়।

আমাদের দেশ এই সুবিধা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে। এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার ব্যাপারে জনগণের হয়রানীর শিকার প্রতিরোধ করার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল এবং ডেন্টাল কাউন্সিলের গুগল অফিসারদের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে বিএমডিসির অধীনে সকল ডাক্তারদের এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো গুগলে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। দেশের বেসরকারি কিছু হাসপাতালের ক্ষেত্রে এমন সুবিধা থাকলেও পুরো দেশে এই সুবিধা এখনও বিস্তার করা হয়নি।

২.এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার সময় রোগীর নামের পাশাপাশি জন্মতারিখ ও মোবাইল নাম্বারও উল্লেখ করা হয় যাতে করে একই নামের দুই রোগী থাকলেও কোনো ভুল বোঝাবোঝির শিকার না হতে হয়।

৩. রোগী চেম্বারে আসার পর রোগীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী ও রোগের বর্ণনাসমূহ, যা মেডিকেলের ভাষায় “পেসেন্টস্ হিস্ট্রী” বলা হয়ে থাকে, সেগুলো কম্পিউটারে রোগীর নাম ও জন্মতারিখ উল্লেখ করে একটা ফোল্ডারের মাধ্যমে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এই ফোল্ডারটি হাসপাতালের কিংবা চেম্বারের রিসেপশনে রাখা কম্পিউটারের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ডাক্তারের ব্যক্তিগত কম্পিউটারেও সংরক্ষিত থাকে। চিকিৎসাধীন সময়ে ওই রোগীর যতবার ডাক্তারের ফলোও-আপ কিংবা পরবর্তী সাক্ষাতের প্রয়োজন হয় রোগীর স্বাস্থ্যন্নতির তথ্যসমূহসহ সমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষা ও রিপোর্টসমূহ নতুন করে ওই ফোল্ডারে যুক্ত করা হয়। এই পদ্ধতিতে রোগীর উন্নতি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত সহজ। রোগী যদি স্বেচ্ছায় তার রোগের সমস্ত টেস্ট রিপোর্ট চায় তাহলে সেই ফোল্ডার থেকে প্রিন্ট করে সেগুলো রোগীর নিকট দেওয়া হয়।

আমাদের দেশে হাসপাতালের অভ্যর্থকসহ বেশীরভাগ বড় বড় ডাক্তাররা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে এখনও অভ্যস্ত না যার ফলে রোগীদের এসব হিস্ট্রী থেকে শুরু করে টেস্ট রিপোর্টসহ রোগীর উন্নতির সমস্ত তথ্য একটা ফাইলে রাখা হয় যা রোগীর অধিনেই থাকে। পরবর্তী সাক্ষাতের সময় ওই ফাইল নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে আসতে হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে রোগীরা সেই ফাইল হারিয়ে ফেলে এবং ডাক্তাররা সঠিক হিস্ট্রীর অভাবে রোগীর সমস্যা নিশ্চিত করার জন্য পুণরায় বিভিন্ন টেস্ট দিয়ে থাকে। যার ফলে রোগীদের সময়ের এবং আর্থিক ভোগান্তির মুখে পরতে হয়। সরকার যদি এই ক্ষেত্রে ডাক্তারসহ হাসপাতালের অভ্যর্তকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সুযোগ করে দিত তাহলে এসব ভোগান্তি একেবারেই দূর হত।

৪.ডাক্তারের সম্মুখীন হওয়ার আগে হাসপাতালের কিংবা চেম্বারের নার্সরা রোগীর বিএমআই(ওজন এবং উচ্চতার অনুপাত), রক্তচাপ, তাপমাত্রা, পাল্স(স্পন্দন) ও শ্বাসপ্রশ্বাসের হার পরীক্ষা করে থাকে যেগুলোর পরিমাপ রোগীর সেই ফোল্ডারে রেকর্ড করা হয়।আর এসব পরিমাপগুলো অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবনধারা ও খাদ্য অভ্যাসের উপর নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে ঔষধসেবনের পাশাপাশি রোগীর খাদ্যতালিকা নির্ণয় এবং নির্দিষ্ট বেয়ামেরও পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।ডাক্তারের কাছে রোগীর সমস্যা নিয়ে যাওয়ার পর পর্যবেক্ষণ শেষে ডাক্তার যেসব ঔষধ নির্ধারণ করে সেগুলোর নাম, রোগীর নাম, জন্মতারিখ ও মোবাইল নাম্বার সহ রোগীর বাসস্থানের কাছাকাছি কোনো ঔষধালয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই ঔষধালয় সব ঔষধ গুছিয়ে নিয়ে রোগীর সঙ্গে মোবাইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ঔষধ সংগ্রহণ করার জন্য। রোগী বা রোগীর কোনো আত্মীয় সেখানে গিয়ে রোগীর নাম আর জন্মতারিখ বলে ঔষধ সংগ্রহ করে। আর কোন ঔষধ কখন ও কিভাবে নিয়ম করে খেতে হবে তা ঔষধের বক্সের ওপরই ডাক্তারের নাম সহ লেখা থাকে। এতে করে ঔষধ খোঁজার জন্য রোগীদের এক ঔষধালয় থেকে অন্য ঔষধালয়ে ছোটাছুটির ভোগান্তি পোহাতে হয়না।

আমাদের দেশে যেহেতু ঔষধালয়গুলো এতটা উন্নত না, সেক্ষেত্রে প্রত্যেকটা ঔষধালয়ের নির্দিষ্ঠ মোবাইল নাম্বার থাকা জরুরী যেই নাম্বারে কল দিয়ে যে কেউই সেই ঔষধালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। হাসপাতাল ও ডাক্তারদের চেম্বারগুলোতে শহরের সমস্ত ঔষধালয়ের মোবাইল নাম্বার রাখা উচিত যেন রোগীর সমস্ত ঔষধ নিয়মাবলী, রোগীর নাম আর মোবাইল নাম্বারসহ রোগীর বাসস্থানের কাছাকাছি কোনো ঔষধালয়ে ম্যাসেজের মাধ্যমে পাঠানো হয়। আর ঔষধ জোগাড় করে যেন ঔষধালয় থেকে রোগীর সাথে যোগাযোগ করা হয়।এতে করে ঔষধ খোঁজার ভোগান্তি থেকে যেন রোগীরা রেহাই পায়।

আমাদের দেশে প্রত্যেক হাসপাতালে এখনও পুষ্টিবিদ নেই। রোগীর ভিঁড ও সময়ের স্বল্পতার কারণে ডাক্তাররাও অসুস্থতা ছাড়া রোগীর খাদ্য অভ্যাস ও জীবনধারার ব্যপারে এতটা মনোযোগী হন না। যার ফলে রোগীর জীবনধারার ক্ষতিকর দিকগুলো অপরিবর্তিত থেকে যায়। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা যথাযথ না হলে শুধুমাত্র ঔষধসেবনে রোগ একেবারে নির্মুল হওয়া সম্ভব না।

৫.সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্হ্যব্যবস্থা যা বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোতে খুব সাধারণ তা হল হেল্থ ইন্সুরেন্স বা স্বাস্থবীমা। এই স্বাস্থ্যবীমা হল মূলত সরকারের পক্ষ থেকে একজন মানুষের স্বাস্থের কল্যাণে নির্ধারিত অর্থ যার ফলে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা যায়। দেশের সকল বৈধ নাগরিক এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। নাগরিক হিসেবে আয়কর দেওয়ার সুবাধে সরকারের তরফ থেকে স্বাস্থ্যবীমাসহ আরো অনেক সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়।

আমাদের দেশকে বিশ্বের দরবারে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে অবশ্যই ওইসব উন্নত দেশের মত আমাদের দেশেও প্রত্যেক বৈধ নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রচলন করতে হবে যাতে করে অন্তত সবাই বিনামূল্যে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারে। এতে করে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অর্থনৈতিক অরাজকতা অনেকটা কমবে এবং অনেক ডাক্তাররাও নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী অতিরিক্ত ভিজিট-ফি দাবি করতে পারবেনা। চিকিৎসকদের বেতন ও যাবতীয় সুযোগ সুবিধা সম্পূর্ণ সরকারের এবং স্বাস্থ্যবীমা কোম্পানিদের দায়িত্বে থাকা উচিত।

৬.এসব উন্নত দেশগুলোর মত ডিজিটাল থার্মোমিটার, স্ফিগমোমেনোমিটার সহ অনেক দৈনিক চেক-আপের যন্ত্রসমূহ আমাদের দেশে এখনও খুব বিরল। এমনকি এই করোনাকালীন সময়ে প্রত্যেক হাসপাতালগুলোতে ডিস্পজেবল বিপি কাফ্স, থার্মোমিটারসহ দৈনন্দিন চিকিৎসা যন্ত্রসামগ্রী যথেষ্ট পরিমাণে নেই। এই ক্ষেত্রে পরবর্তী বাজেটে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যেন বিশেষভাবে নজরদারী করা হয় এবং ডিজিটাল চিকিৎসা যন্ত্রসামগ্রী দেশে আমদানী করার সুব্যবস্থা যেন গ্রহণ করা হয়।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে চিকিৎসাব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রচলন অনেক বৃদ্ধি করতে হবে । সেই সাথে বড় বড় চিকিৎসক থেকে শুরু করে এই যুগের মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং নার্সদেরও প্রযুক্তির সাথে ভালভাবে পরিচিত হতে হবে। যুগের বিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষিত সকল নাগরিকেরও উচিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের আধুনিক করা। যে আধুনিকতায় পুরো দেশ উপকৃত হবে এমন আধুনিকতাই দেশের পরিচালনা ব্যবস্থায় প্রয়োজন।

লেখক: ৫ম বর্ষের মেডিকেল ছাত্রী, জয়নুল হক সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ

...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
© All rights reserved © 2020 Public Reaction
Theme Customized By BreakingNews